কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো


কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ১

মুলঃ মেরিনার

পবিত্র কুর’আন, দ্বীন ইসলামে এবং ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, পৃথিবীর আর কোন একটি ধর্মের বেলায়, সেই ধর্মের ধর্মগ্রন্থকে এ ধরনের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। মুসলিম জীবনে কুর’আনের ভূমিকা কি তা অনুভব করার ব্যাপারটাও হয়তো বা সবার জন্য উন্মুক্ত নয় – অনেকে যেমন মনে করেন যে, কুর’আনের পথনির্দেশনা এবং নিরঙ্কুশ জ্ঞানের ভান্ডারও সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, কেবল বিশ্বস্ত বিশ্বাসী বা সম্ভাব্য হেদায়েত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন সৌভাগ্যবানদের জন্যই তা উন্মুক্ত হয়ে থাকে। তেমনি এই ব্যাপারটাও – অর্থাৎ, কুর’আনের ভূমিকার গুরুত্ব বোঝার ব্যাপারটাও – সম্ভবত কেবল নির্বাচিত ও বিশিষ্টদের জন্য নির্ধারিত। ইহুদী বা খৃস্টধর্মাবলম্বী কুফফার ওরিয়েন্টালিস্টগণ – খৃস্টধর্মের উপর যাদের রয়েছে বিস্তর পড়াশোনা – তারা তাদের নিজেদের মত করে ব্যাপারটাকে কিছুটা আঁচ করার চেষ্টা করেছেন। তারা বলেছেন যে, খৃস্টধর্মের বেলায় যীশুর যে গুরুত্ব – ইসলামের বেলায় কুর’আন সেই ধরনের গুরুত্বের অধিকারী। ‘যীশুকে অবতার ভাবার’ মত কুফরে নিমজ্জিত থেকেও, তারা একধরনের ব্যাখ্যা দান করার চেষ্টা করেছেন। তারা বলেছেন যে, যীশু হচ্ছেন ঈশ্বরের Word made flesh, আর কুর’আন হচ্ছে ঈশ্বরের Word made book। খৃস্টানদের এই বক্তব্যে, কুর’আন যে আল্লাহর বাণী এই ধারণার একটা vague স্বীকৃতি রয়েছে বলে, আমাদের অনেকেই ভুলে যাই যে, উপরোক্ত বক্তব্যের প্রথমার্ধে একটা সূক্ষ্ম অথচ ভয়ঙ্কর ‘কুফরি’ রয়েছে এবং আমরা মুসলিমরাও নিজেদের অজান্তেই ঐ কুফরির ফাঁদে পা দিই। কুর’আন আল্লাহর বাণী বলে তা আল্লাহর সিফাতের একটা অংশ এবং সেহেতু divine বা ঐশ্বরিক – অর্থাৎ সৃষ্ট বস্তু নয় ; যীশুও যদি আল্লাহর বাণীর ‘রক্ত-মাংসে রূপান্তরিত অবস্থা’ বা Word made flesh হয়ে থাকেন, তবে তো তিনিও divine বা ঐশ্বরিক এবং সৃষ্ট কোন প্রাণী নন! এখানেই নিহিত রয়েছে এমন ধারণা যা ইসলামের দৃষ্টিতে নির্ভেজাল ‘কুফরি’।

রাসূল(সা.)-এঁর ভবিষ্যদ্বাণীকে ইতোমধ্যেই বাস্তবতা দান করে মুসলিম উম্মাহ্ যে আজ ৭৩ ভাগে বা তারও চেয়ে বেশী ভাগে বিভক্ত, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়। অন্য অনেক কিছুর মতই – কুর’আনকে নিয়ে আমরা কি করবো – এই ব্যাপারটা নিয়েই মুসলিম উম্মাহ্ আজ শতধাবিভক্ত। ইসলামের কেন্দ্রীয় ব্যাপার – বলতে গেলে মেরুদন্ড স্বরূপ – এই কুর’আনকে নিয়ে আমাদের অজ্ঞতা ও বিভক্তি কুফফারকে সাহস ও শক্তি যোগায়। তারা বুঝতে পারে যে, আমাদের নিয়ে তাদের ভয়ের কোন কারণ নেই। কুর’আনকে নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য, বিভ্রান্তি ও বিভক্তির রকমফের একাধারে করুণ ও হাস্যকর। অপাঠ্য ছোট্ট অক্ষরে ছাপা কুর’আনকে একদিকে যেমন কেবল মাদুলির মত গলায় ঝুলিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়, তেমনি, কারুকাজপূর্ণ এমন বিশাল কুর’আনও রয়েছে যার শিল্পকর্ম সম্পন্ন করতে হয়তো কোন শিল্পীর গোটা জীবনটাই কেটে গেছে; আবার এমন অনেক কুর’আনিক ক্যালিগ্রাফি আছে যার পাঠোদ্ধার করা আমার মত সাধারণ মুসলিমের জন্য দুরূহ। কুরআন সবার জন্য নয় বরং গণমানুষ অর্থসহ কুরআন পড়তে গেলে বিপথগামী হয়ে যাবে – এমন কথা যেমন উপমহাদেশে দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগকারী গোষ্ঠী বিশেষ প্রচার করে থাকেন। আবার, যে কেউ একখানা কুরআন হাতে নিয়ে অর্থসমেত পড়তে শুরু করলেই, সব সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবেন – এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে – যার মর্মার্থ অনেকটা এরকম যে, একখানা Gray’s Anatomy হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেই, যে কেউ নিজের চিকিৎসা নিজেই করতে পারবেন। কত স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষকে দেখা যায় একটি বর্ণের অর্থ না বুঝেও জীবনের প্রতিটি দিন সকাল বিকাল কুর’আন তেলাওয়াতের (প্রচলিত অর্থে) আমল করে কবরে চলে যান – আবার, কত অভাগা মানুষকে দেখা যায় কুর’আনের ভাষা জানা ও বোঝা সত্ত্বেও তাদের জীবনে কুর’আনের কোন ছাপ নেই। আরো বেশি অভাগা আরেকটা শ্রেণীকে দেখা যায়, পশ্চিম থেকে ধার করা scientific reductionism-এর আলোকে কুর’আনকে ব্যাখ্যা করতে চেয়ে, পথভ্রষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত “কাফির হয়ে যাবার” পরিণতি বরণ করতে (যেমনটা ঘটেছিল ড. রাশাদ খলিফার বেলায়, যিনি ১৯ সংখ্যা ভিত্তিক ফর্মূলায় পবিত্র কুর’আনকে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন)। এটা তো সত্যি যে, কুর’আনের কাছে যাবার সঠিক ও শুদ্ধ পন্থা কি তা না বুঝলেও এবং না জানলেও, আমরা যে কুর’আন থেকে উপকৃত হতে পারছি না – কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন সকল মুসলিমই একথা জানেন। কুর’আন তার অনুসারীদের যে সাফল্য, যে সম্মান, যে আসন, যে শান্তি ও যে অর্জনের অঙ্গীকার করে – বিশ্বব্যাপী কুফফারের লাথি খেয়ে, তাদের পা থেকে পায়ে ঘুরে বেড়ানো মুসলিম জনসমষ্টিসমূহকে দেখে কোথাও তার কোন চিহ্ন খুজে পাওয়া দুষ্কর। বরং, স্বাভাবিক ভাবেই যে কারো মনে হতে পারে যে, কোথাও মারাত্মক কোন গোলমাল বা সমস্যা রয়েছে – এবং নিম্ন মানের ঈমান সম্পন্ন কারো, গভীর নিরাশা উদ্ভূত কুফরিতে ডুবে যাবার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমরা আল্লাহর কাছে শয়তানের চিরন্তন অবস্থা: আল্লাহর দয়ায় নিরাশ হওয়া থেকে আশ্রয় চাই এবং সেই নৈরাশ্যের আনুষঙ্গিক কুফরি থেকেও আশ্রয় চাই। আমীন!!

(চলবে……..ইনশা’আল্লাহ্!)

কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ২

[এই পর্বের আগের লেখাটা রয়েছে এখানে: ]

মুলঃ মেরিনার

…………..পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:

আল্লাহ্ সুবহানাহুওয়া তা‘আলা পবিত্র কুর’আনে বলেছেন:

لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآَنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
যদি আমি এই কোরআন পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তাআলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্যে বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তাভাবনা করে। (সূরা হাশর, ৫৯:২১)

অথচ কই, যাদের জন্য ও যাদের কাছে এই কুর’আন নাযিল হয়েছে, তাদের মাঝে তো কুর’আন শ্রবণকালে সেই বিনয়, শ্রদ্ধাবোধ বা সমীহভাব জেগে ওঠে না! ইমাম আনোয়ার আল আওলাকি তাঁর এক খুৎবায় বলেন যে, ইসরাইলী রাষ্ট্রীয় রেডিও থেকে নাকি আরবদের জন্য কুর’আন তিলাওয়াত (প্রচলিত অর্থে) সম্প্রচার করা হয়, কারণ ইহুদীরা জানে যে, উদ্দিষ্ট আরবরা কুর’আন বুঝে না বিধায় তাদের উপর কুর’আন কোন প্রভাব বিস্তার করবে না – আর তাই তা সম্প্রচার করা একেবারেই নিরাপদ। আমাদের দেশের অবস্থা আরও করুণ!! আপনি দেখবেন কোন বাজারে দিনের শুরুতে দোকানদার, বারাক্বার (অর্থাৎ বরকতের) জন্য পবিত্র কুর’আনের তিলাওয়াতের একটা ক্যাসেট ছেড়ে দিয়ে অনায়াসে বিকিকিনি চালিয়ে যাচ্ছে – এমনকি ভিডিও সিডির দোকানেও। কিছুদিন আগে দৌলতদিয়া ঘাটের বেশ্যা পুনর্বাসন আন্দোলনের সভা নাকি শুরু হয়েছিল যথারীতি কুর’আন তিলাওয়াত দিয়ে।

এই পর্যায়ে আমার একটা অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে share করতে চাই। এই তো কিছুদিন আগে সিলেটে আমার দেশের বাড়ীতে যাবার সময় আমরা সদ্য চালু হওয়া বহুল প্রশংসিত আধুনিক এক কোম্পানীর বাসে চড়েছিলাম – আত্মীয় স্বজনের মুখে আরমদায়ক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য যাত্রার অনেক সুনাম শুনে ঐ বাসে যাওয়া। যাত্রা শুরু হলো সূরা ইয়াসীনের বাংলা তর্জমা সহকারে তিলাওয়াত দিয়ে। একসময় তিলাওয়াত শেষে টিভি সেটে হিন্দি গান ইত্যাদির ভিডিও শুরু হলো। অনেকদিন ধরে আমার ঘরে টিভি চলেনা বলে এবং বিনোদন জগতের সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই বলে আমি প্রায় ভুলেই বসেছিলাম যে, “আ মরি বাংলা ভাষা” বলে মায়াকান্না কাঁদা বাংলাদেশী বাঙ্গালীদের কাছে হিন্দি ও হিন্দু সংস্কৃতির উপাদান, প্রায় শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মতই অত্যাবশ্যক – যা বিহনে সাড়ে ৪ ঘন্টার ঐ ‘বি-শা-ল’ (!!)সময় অতিক্রান্ত হওয়া বুঝি এক অকল্পনীয় একটা ব্যাপার !!! তাই বুঝি অধীর আগ্রহে অনেকে অপেক্ষা করে ছিলেন যে, কখন ঐ অর্থহীন ও বৈচিত্রহীন একঘেঁয়ে বাক্যালাপ শেষ হয়। গান বাজনা শুরু হতে বাসে যেন প্রাণের স্পন্দন ফিরে এলো – এমনকি হিজাব পরতে সচেষ্ট এক মা, তার বয়ঃসন্ধিতে উপনীত পুত্রের সাথে চটকদার অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে আলাপ করতে করতে হাসতে হাসতে যে ভাবে ওগুলো গিললেন, তাতে বোঝা গেলো বাড়ীতেও তারা ‘সপরিবারে’ ওসব উপভোগ করে থাকেন। ঐ একই পরিবারের সাফারী স্যুট পরা (সুন্দর ভাবে ছাঁটা) দাড়ি ওয়ালা আধুনিক ইসলামপন্থী সদৃশ বাবা, সামনের সারিতে একেবারে ঝুলন্ত টিভি সেটটির নীচেই বসেছিলেন তার আত্মজাকে নিয়ে – তার মুখেও কোন অস্বস্তির চিহ্ন দেখেছি বলে মনে করতে পারিনা। সমাজতন্ত্রী কুফরপন্থীরা যে ইসলামপন্থীদের প্রতিক্রিয়াশীল বলে গাল দেয় – সেই অপবাদ বুঝি এতদিনে ঘুচ্লো। আমার সিলেট ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়ে রইলো এমন কিছু রিমেক হিন্দি গানের দৃশ্য, যা দেখে আমি বুঝলাম যে, মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেছে – নাস্তিক ও কাফিরদের নেতৃত্বাধীন পৃথিবীর সর্ব সাম্প্রতিক যৌন বিকৃতি pedophilia-র উপাদান, আমাদের এই উদারপন্থী মুসলিম দেশের মুসলিম ভাই-বোনদের মগজে ইতোমধ্যেই চাঞ্চল্যকর আবেদনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে – ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!!

মধ্যবয়সে উপনীত হয়ে পবিত্র কুর’আন যখন প্রথমবারের মত অর্থসহ পড়ে শেষ করলাম, তখন এই ভেবে পুলকিত বোধ করেছিলাম যে, একটা অনস্বীকার্য কর্তব্য বুঝি দেরীতে হলেও এতদিনে সমাধা করা গেলো। পরে যখন কোন বিশ্বমাপের ‘আলেমের বর্ণনায় কোন একটা আয়াতের ব্যাখ্যা শুনে মনে হয়েছে যে, ঐ ধরনের বক্তব্য এই প্রথমবারের মত শুনলাম – তখন বুঝলাম যে অর্থসহ কুর’আন পড়া, আর কুর’আনের অর্থ অনুধাবন করা এক ব্যাপার নয়। কিন্তু আমরা যারা দ্বীন শিক্ষায় শিক্ষিত নই, অথচ যে কোন ‘হুজুরের’ উপর যারা আস্থা রাখতে পারিনা, তারা তাহলে কোথায় যাবো? এছাড়া আমরা যারা নিজ চেষ্টায় বহু কষ্টে ইসলাম শিখার ও জানার চেষ্টা করছি, তারা যখন কোন আত্মীয় বা সুহৃদকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে কোন একটা খারাপ বা পরিত্যাজ্য বিষয় থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে কোন আদেশ বা নিষেধ করছি – তখন সেই আত্মীয় বা সুহৃদ অনায়াসে জাতীয় পর্যায়ের এমন একজন ‘আলেম পেয়ে যাচ্ছেন, যিনি তার সকল কর্মকান্ডকে জায়েজ করে দিয়ে, তার মনের অপরাধবোধ নিমেষেই দূর করে দিচ্ছেন। এভাবেই তাহলে দৌলতদিয়া ঘাটের বেশ্যাদের আন্দোলনের সভায় কুর’আন তিলাওয়াত ও দোয়া করার জন্য ‘হুজুর’ পাওয়া যাচ্ছে, আর এভাবেই তাহলে আত্মস্বীকৃত কাফির হুমায়ুন আজাদের জানাজা পড়ানোর জন্যও লোকের অভাব হয়নি আমাদের এই ‘উদারপন্থী মুসলিম দেশে’ – এভাবেই তাহলে চিত্র-নায়ক ও চিত্র-নায়িকাদের সমন্বয়ে চিত্রায়িত ‘ইসলামী নাটক’কে জায়েজ মনে করেছেন এক শ্রেণীর ‘আলেমরা। আর এভাবেই তাহলে Indian idol বা হিন্দুস্থানী মূর্তির পূজার আয়োজনে “নীরবতা সম্মতির লক্ষণ” – এই সূত্র অনুযায়ী, সায় দিয়েছিলেন, বিলাসিতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়া আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া বিজ্ঞ ইসলাম বিশারদরা।

এরকম একটা সংশয়ের ভিতর, বোধশক্তির যখন অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় একটা অবস্থা – তখন আমি ধর্মান্তরিত মুসলিম, ভাই Jamaal al-Din M. Zarabozo-র লেখা How to Approach and Understand the Quran বইখানি পড়তে শুরু করি। এসময় আমি আরো জানি যে: এক সময় ওমর (রা.) ভাবছিলেন যে একই নবী এবং একই কিবলা থাকা সত্ত্বেও কেন মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হবে। তিনি ইবনে আব্বাসের (রা.) কাছে লোক পাঠালেন এবং এ সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, আমাদের মাঝে কুরআন নাযিল হয়েছিল আমরা তা আবৃত্তি করি এবং আমরা জানি যে, কি নাযিল হয়েছিল। আমাদের পরে এমন মানুষজন আসবে, যারা কুরআন আবৃত্তি করবে, কিন্তু যারা জানবে না যে কোন পটভূমিতে তা নাযিল হয়েছিল। সুতরাং তারাতাদেরমতামতব্যবহারকরবে (কুরআন ব্যাখ্যার ব্যাপারে) আর তারা যখন তাদের মতামতের শরণাপন্ন হবে, তখনই তারা মতপার্থক্য পোষণ করবে এবং একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে।

আজ বুঝি আমরা সেই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি – যখন সবাই সবার মতবাদ ব্যাখ্যা করতে বা নিজ মতামতকে যথাযথ প্রমাণ করতে, নিজ মনগড়া উপায়ে কুর’আনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

কুর’আনের কাছে যাবার, কুর’আনের ভাষা ও বক্তব্য বুঝবার, কুর’আনের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবার এবং কুর’আনের কাছ থেকে উপকৃত হবার সঠিক পন্থাসমূহ কি কি – সে সম্বন্ধে অমূল্য তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ এই বইখানি পড়া থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান, বাংলাভাষী দ্বীনী ভাই-বোনদের সাথে ভাগাভাগি করার অদম্য ইচ্ছা থেকেই মূলত এই কাজে হাত দেয়া।

(চলবে ….ইনশা’আল্লাহ্!)

কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ৩

Posted: 07 May 2011 08:19 AM PDT

[মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]

এইসিরিজেরআলোচ্যবিষয়াবলী

পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ বলেন:

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ (15) يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ

হে আহলে কিতাব! তোমাদের কাছে আমাদের রাসূল এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা কিছু লুকিয়ে রাখতে তা প্রকাশ করতে এবং যা কিছু অপ্রয়োজনীয় তা বাদ দিতে। আল্লাহর কাছ থেকে তোমাদের কাছে এক (নতুন) আলো এবং হেদায়েত দানকারী গ্রন্থ এসেছে। যা দিয়ে আল্লাহ্ তাদের সকলকে পথ নিদের্শনা দেন, যারা শান্তি নিরাপত্তার পথে তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং তাদের, তাঁর ইচ্ছামত অন্ধকার থেকে সেই আলোতে বের করে নিয়ে এসে সেই পথে পরিচালিত করেনযা সরল। (সূরা মায়িদা, ৫:১৫-১৬)

الر كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ
আলিফলামরা, একখানি কিতাব, যা আমরা তোমার কাছে নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানবজাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে নিয়ে আসতে পারোতাঁর পথে যিনি পরাক্রমশালী, সকল প্রশংসার দাবীদার। (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:১)

আল্লাহ্ আরো বলেন,

إِنَّ هَذَا الْقُرْآَنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا
নিশ্চয়ই এই কুরআন যা সবচেয়ে সঠিক তার দিকেই পরিচালিত করে……”(সূরা ইসরা, ১৭:৯)

কুর’আনের এই বাণীগুলো পড়ে যখন কোন অবিশ্বাসী কাফির বা সন্দেহবাদী আজকের পৃথিবীর মুসলিমদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক অবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখবে, তখন সে প্রশ্ন করতে পারে :কুরআনের এই কথাগুলো কি বাস্তবিকই সত্যি? যারা কুরআনের এই কথাগুলোকে বিশ্বাস করে বলে জীবনে প্রয়োগ করে বলে দাবী করে, তাদের জীবনে এসবের প্রভাব প্রতিফলন কোথায়? কেউ কি মুসলিমদের সত্যি আলোর জগতে বসবাস করতে দেখে, নাকি স্বভাবতই তাদের এক অন্ধকার জগতের বাসিন্দা বলে মনে হয়?

স্পষ্টতই, কুর’আনে লিপিবদ্ধ আল্লাহর এই কথাগুলো সত্য। এ কথাগুলোর ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আসলে কেউ যখন কুর’আনের ইতিহাস পড়ে দেখবেন এবং অতীতে যারা কুর’আন বিশ্বাস করেছিলেন, তাদের উপর কুর’আনের কি প্রভাব পড়েছিল সে সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করবেন – তখন যে কেউ অনুধাবন করবেন যে, কুর’আনের উপরোক্ত আয়াতগুলোতে বর্ণিত কথাগুলো তাঁদের জীবনে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এক বাস্তবতা যে, মুসলিমরা দিকনির্দেশনা সম্বলিত এই মহান কিতাবখানির অধিকারী হলেও, বর্তমানে তাদের জীবনে এর শিক্ষার আশীর্বাদ বা দিকনির্দেশনার কোন প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় না। এই বাস্তবতা কারো কারো কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। মুসলিমরা বর্তমানে যে অবস্থায় পতিত হয়েছে – কি করে সেই পরিণতিতে তারা পৌঁছতে পারে – কারো জন্য তা অনুধাবন করা কষ্টকর হতে পারে। মুসলিমরা কিভাবে কুর’আনকে গ্রহণ করছে এবং আত্মস্থ করছে – এর মাঝেই সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে। সম্ভবত, কুর’আনের প্রতি তাদের আচরণে কোথাও কোন সমস্যা রয়েছে। এ থেকে এমন একটা অবস্থার উদ্ভব হয় যে, কোন একটা বিষয়ে কুর’আনে দিকনির্দেশনা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানবতার উপর তার যে প্রভাব প্রতিফলিত হবার কথা ছিল – তা হচ্ছে না।

আমাদের এই প্রচেষ্টায় আমরা তাই, আজকের দিনের অনেক মুসলিম কুর’আনের সাথে কি ধরনের আচরণ করছেন – সেদিকে আলোকপাত করব। তারপর আমরা চেষ্টা করবো, সঠিক আচরণটা কি – তা ভেবে দেখতে। সবশেষে পবিত্র কুর’আনকে সঠিক ভাবে বোঝার ও ব্যাখ্যা করার পন্থা কি হতে পারে, তা নিয়েও আমরা আলোচনা করব ইনশা’আল্লাহ্!

কুর’আন তার অনুসারীদের জন্য কি ধরনের জীবনযাত্রা প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং বাস্তবে আজকের মুসলিমদের জীবনযাত্রার শোচনীয় অবস্থার মাঝে যে দুস্তর ব্যবধান, তার কারণসমূহ বুঝবার এই প্রচেষ্টায় আমরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে আলোচনা করবো ইনশা’আল্লাহ্:

. আলোচ্য বিষয়াবলী
. কুরআনের বৈশিষ্ট্য এবং এর প্রতি আমাদের কর্তব্য
. কুরআনিক প্রজন্ম
. কুরআনের প্রতি সমকালীন মুসলিমদের আচরণ
. কুরআনের মুখ্য উদ্দেশ্য
. কুরআনের নিকটবর্তী হবার পন্থা করণীয়
. কুরআন ব্যাখ্যার (তাফসীরের) সঠিক পন্থা
. কুরআনের কাছে প্রত্যাবর্তনের আবশ্যকতা
. উপসংহার বা শেষ কথা।

আমরা আশা করছি যে, আমাদের এই প্রচেষ্টায় সংযোজিত বা আলোচিত বিষয়াবলী বিচার-বিশ্লেষণের পরে, কুর’আন বোঝার ব্যাপারে আমাদের দুর্বলতা ও দীনতা অনেকাংশেই দূর হবে ইনশা’আল্লাহ্। আমাদের এই প্রচেষ্টার মূলে রয়েছে এই অপূর্ব সুন্দর ও অলৌকিক কুর’আন থেকে বাংলাভাষী মুসলিমরা যাতে যথাসম্ভব বেশি উপকৃত হতে পারেন, সে ব্যাপারে তাদের সহায়তা করা। যেভাবে কুর’আনের নিকটবর্তী হওয়া উচিত, সেভাবে কুর’আনের কাছে যেতে পারলেই তাদের উপর কুর’আনের সেই কাঙ্খিত প্রভাব অনুভূত ও প্রতিফলিত হবে। তখন, কুর’আন মুসলিমদের আল্লাহর আরো কাছাকাছি নিয়ে যাবে, এবং ইসলাম সম্বন্ধে তাদের জ্ঞানকে আরো পরিপূর্ণ করে দেবে। তারা তখন এই পৃথিবীতে তাদের সত্যিকার ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারবেন। সবশেষে আমরা আশা করবো, কুর’আনের সঠিক জ্ঞান আখিরাতে তাদের জান্নাতের পথে নিয়ে যাবে – কুর’আনের সঠিক জ্ঞান ও প্রয়োগ আখিরাতে তাদের পক্ষে এক প্রমাণ ও মধ্যস্থতাকারী স্বরূপ কাজ করবে – আর আল্লাহ্ তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকবেন, ইনশা’আল্লাহ্!।

(চলবে ……ইনশা’আল্লাহ!)

মুলঃ মেরিনার

কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ৪

মূলঃ মেরিনার

কুরআনেরবৈশিষ্ট্যএবংএরপ্রতিআমাদেরকর্তব্য

কোন মুসলিমই সম্ভবত কখনো এই সত্যটা ভুলে যান না যে, কুর’আন হচ্ছে সরাসরি আল্লাহর বাণী যা তিনি তাঁর শেষ রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)-এঁর কাছে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও, একজন মুসলিম এই সত্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পূর্ণরূপে নাও বুঝতে পারেন। কুর’আনে আল্লাহ্ যেসব চমৎকার বিষয়াবলী বর্ণনা করেছেন, তার কিয়দংশ তিনি ভুলে থাকতে পারেন – অথবা রাসূল (সা.) কুর’আন সম্বন্ধে যা বলেছেন, সে ব্যাপারটাকেও হয়তো তিনি অবহেলা করে থাকতে পারেন। এই অধ্যায়ে তাই আমরা প্রথমে চেষ্টা করবো কুর’আন আসলে কি, তা পাঠককে মনে করিয়ে দিতে। নিঃসন্দেহে একজন বিশ্বাসী কুর’আন সম্বন্ধে যত জানবেন – কুর’আনের কাছ থেকে তিনি তত বেশি নিতে চাইবেন। কোন ব্যক্তি কুর’আনকে যত বেশি উপলব্ধি করবেন, তত বেশি তিনি সেটাকে তার হৃদয় ও মনের কাছাকাছি রাখতে চাইবেন। অবশ্যই যিনি কুর’আনকে সবচেয়ে ভাল জানেন, তিনি হচ্ছেন এর বক্তা – স্বয়ং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা। তাই প্রথমে আমরা কুর’আনের কিছু নির্বাচিত আয়াত আলোচনা করবো, যেসব আয়াতে কুর’আন নিজের সম্বন্ধে কথা বলে। কুর’আনের উপলব্ধিতে যাঁর স্থান দ্বিতীয়, তিনি হচ্ছেন নবী মুহাম্মাদ (সা.), যাঁর কাছে এই কুর’আনের বাণী প্রেরণ করা হয়েছিল। আমরা তাই কুর’আন সম্পর্কে তাঁর কিছু নির্বাচিত বাণী আলোচনা করবো। এরপর আসছে ঐ সব মহান ব্যক্তিদের কথা, যাঁরা আল্লাহর রাসূলের (সা.) কাছ থেকে সরাসরি কুর’আন শিখেছিলেন এবং জীবনে তা প্রয়োগ করেছিলেন। আমরা কুর’আনের ব্যাপারে সাহাবীদের বক্তব্য তাই উপস্থাপন করব। এই বষিয়ে আলোচনার শেষের দিকে এই মহান গ্রন্থের প্রতি একজন মুসলিমের কর্তব্য কি – আমরা তা নিয়ে এক সাধারণ আলোচনা করব, ইনশা’আল্লাহ্!

আল্লাহ্কুরআনসম্বন্ধেকিবলেন

সূরা বাক্বারার শুরুতেই আল্লাহ্ বলেন :
ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, যা আল্লাহ্্কে যারা ভয় করে তাদের জন্য এক পথনির্দেশক। (সূরা বাক্বারা, ২:২)

গতানুগতিক অনুবাদে কারো মনে হতে পারে যে, এই আয়াতে কুর’আন সম্বন্ধে এমন বিশেষ কিছু বলা হয়নি। যদিও বাস্তবে আল্লাহ্ এই একটি আয়াতে কুর’আন সম্বন্ধে অনেক কয়টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এই বর্ণনায় লক্ষ্য করার মত প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ কুর’আনকে ‘নির্দেশক সর্বনাম’ ذَلِكَ সহকারে নির্দেশ করেছেন – সাধারণভাবে যার অনুবাদ হবে ‘ঐটা’ (কিন্তু ‘এটা’ নয়)। এখানে ‘এটা’র পরিবর্তে ‘ঐটা’ ব্যবহার করার কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। আবদুল হামিদ সিদ্দিকী তাঁর কুর’আনের অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় এ সম্বন্ধে বলেছেন :নির্দেশক সর্বনামذَلِكَ (that) অবস্থানের দূরত্ব নির্দেশ করে, কিন্তু সময় বিশেষে কোন বস্তুর প্রতি সম্মান সম্ভ্রম/সমীহ প্রদর্শন করতেও এর ব্যবহার হয়ে থাকে, যেমনটি আমরা কুরআনে হতে দেখি।

দ্বিতীয়ত, বাক্যাংশটি অনেকটা “এই সেই কিতাব” এমন একটা অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। যার নিহিতার্থ হচ্ছে এরকম যে, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ এবং আর কোন গ্রন্থকেই, কুর’আনকে যেভাবে একটি ‘গ্রন্থ’ বলা যায় সেই বিচারে গ্রন্থ বলা যাবে না। এই গ্রন্থ হচ্ছে সেই বাস্তব গ্রন্থ, যা এমন সব বিষয়বস্তু ধারণ করে যা পূর্ববর্তী কোন কিতাবে ছিল না। অন্য কথায়, আল্লাহ্ এই কিতাবের পূর্ণতা ও নির্ভুলতার দিকে ইঙ্গিত করে, অন্য সকল কিতাবের উপর এর শ্রেষ্ঠত্বের দিকে ইঙ্গিত করছেন।

তৃতীয়ত, আল্লাহ্ বলছেন যে, এটা এমন একখানি গ্রন্থ যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। অথচ অনেক অবিশ্বাসী বা সন্দেহবাদী কিতাবখানিকে সন্দেহের চোখে দেখে। আমাদের তাই বুঝতে হবে যে, আলোচ্য আয়াতে কেউ কখনো কুর’আনের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে না এমন কথা বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, কুর’আন যে আল্লাহর তরফ থেকে নাযিলকৃত একখানা সত্য ও নির্ভুল গ্রন্থ, তার পক্ষে সাক্ষ্যাপ্রমাণ এতই বিশাল ও স্পষ্ট যে, এই গ্রন্থে কারো সন্দেহ পোষণ করার কোন কারণ বা অবকাশ নেই। এই কথাটা গোটা কিতাব এবং এর দিক নির্দেশনার প্রতিটি অংশবিশেষের বেলায়ও একই রকম প্রযোজ্য। এই বইয়ে আল্লাহ্ যা বলেছেন, তার কোন কিছু সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আবদুর রহমান আল সাদী যেমন বলেন যে, আলোচ্য আয়াতে কোন সন্দেহ নেই বলে এটাই বোঝানো হচ্ছে যে, একজন বিশ্বাসীর এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক যে, এই কিতাবে বর্ণিত সবকিছু সত্য।

চতুর্থত, আল্লাহ্ এই কিতাবকে এক দিক নির্দেশনা(বা হুদা) বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ কিসের ব্যাপারে দিক নির্দেশনা সে কথাটা উল্লেখ করা হয়নি – ফলে একটা সাধারণ দিক নির্দেশনার ধারণা এখানে বলবৎ রয়েছে। দুনিয়া ও আখিরাতের সকল প্রয়োজন ও সকল লাভের ব্যাপারেই কুর’আন হচ্ছে এক পথ-প্রদর্শক। অত্যাবশ্যকীয় মৌলিক অথবা স্বল্প আবশ্যকীয় গৌণ – সকল বিষয়েই কুর’আন হচ্ছে মানুষের জন্য পথ নির্দেশকারী। তা সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করে দেখায় – আর পূর্ণতাকে অসম্পূর্ণতা থেকে স্পষ্টত আলাদা করে দেখায়। এছাড়া মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত, উভয় জীবনের জন্য লাভজনক একটা পথ ধরে কিভাবে চলতে হবে – তাও এই কিতাব পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দেয়।

এই আয়াত তাই আমাদের বলে দিচ্ছে যে, কুর’আন হচ্ছে সর্বোপরি পথ-নির্দেশনার একখানি গ্রন্থ। সবশেষে এই আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, যারা আল্লাহ্ সম্বন্ধে সচেতন, তাদের জন্য কিতাবখানি হচ্ছে পথ-নির্দেশনা। কুর’আনের অন্যত্র আল্লাহ্ বলেছেন :
هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ
“…
মানবজাতির জন্য এক পথনির্দেশনা যাচাইয়ের (সত্যমিথ্যা) জন্য এক স্পষ্ট প্রমাণ…” (সূরা বাক্বারা, ২:১৮৫)

কুর’আনের এই দুইটি আয়াত (২:২, ২:১৮৫) আমাদের বলে দিচ্ছে যে, কুর’আনের দিক-নির্দেশনা ও তা থেকে লাভবান হবার সম্ভাবনা সবার জন্য উন্মুক্ত।অথচ, সবাইএইচমৎকারদিকনির্দেশনাথেকেলাভবানহবেনা।কেবলমাত্রতারা, যারাসঠিকপন্থাঅবলম্বনকরেকুরআনকেমেনেচলারজীবনেপ্রয়োগকরারইচ্ছানিয়েএরনিকটবর্তীহবে, তারাইথেকেসত্যিকারঅর্থেলাভবানহবে

(চলবে …………..ইনশা’আল্লাহ্!)

কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ৫

মূলঃ মেরিনার

আল্লাহ্কুরআনসম্বন্ধেকিবলেন

…………..পবিত্র কুর’আনকে আল্লাহ্ রূহ্ বা আত্মা বলে সম্বোধন করে বলেন,

وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا
এভাবে আমি আমার আদেশের এক রূহ্ তোমার কাছে প্রেরণ করেছি…..” (সূরা শূরা, ৪২:৫২)

এই আয়াতের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট ইসলামী ‘আলেম ড. সালিহ আল ফাওযান বলেছেন যে, রূহ্ হচ্ছে এমন একটা ব্যাপার যা হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চার করে। যেমনভাবে শারীরিক হৃদপিণ্ডের জীবন সরাসরি এক রূহের সাথে সম্পৃক্ত, তেমনিভাবে আধ্যাত্মিক জীবনও তার প্রাণ স্পন্দনের জন্য সরাসরি একটি রূহের উপর নির্ভরশীল – আর সেই রূহ্ হচ্ছে পবিত্র কুর’আন। এই কুর’আনই হচ্ছে আধ্যাত্মিক হৃদয়ের প্রাণের উৎস। কারো হৃদয় যদি কুর’আন বিবর্জিত হয়, তাহলে সে হৃদয়ের আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে – পার্থিব বিচারে তা যতই জীবন্ত হোক না কেন।

মানুষের হৃদয় তখনই সত্যিকার জীবন লাভ করে, যখন তা কুর’আনের সাথে মিলিত হয়। কুর’আনের শিক্ষা থেকেই আমাদের হৃদয় তার প্রভুর পরিচয় লাভ করে এবং কিভাবে তাঁর উপাসনা করতে হবে সেই জ্ঞানও লাভ করে। এমতাবস্থায় আমাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ভালবাসা, আল্লাহর প্রতি ভয়, তাঁর প্রতি সম্ভ্রম ও তাঁর কাছে প্রত্যাশা দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটা সুস্থ হৃদয়ের জন্য এগুলো হচ্ছে অতি প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান। শারীরিক হৃদস্পন্দনের জন্য যেমন শারীরিক রূহ্ প্রয়োজন – তেমনি এই আধ্যাত্মিক হৃদয়ের স্পন্দনের জন্য কুর’আনের প্রয়োজন।

রূহ্ হরণের ফলে যে পার্থিব মৃত্যু ঘটে, তার সাথে কুর’আনের অনুপস্থিতিতে আধ্যাত্মিক হৃদয়ের মৃত্যুর তুলনা চলে না। শারীরিক মৃত্যু বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, দুষ্টলোক এবং এমনকি জন্তুজানোয়ার সবার বেলায় প্রযোজ্য – যা হচ্ছে এই পার্থিব জীবন থেকে বিদায়। আধ্যাত্মিক মৃত্যু হচ্ছে এমনই এক অভিজ্ঞতা, অবিশ্বাসীরা প্রতিনিয়ত যার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে এবং যার ফলশ্র“তিতে আখিরাতে চিরতরে তারা জাহান্নামের আগুনে পতিত হবে।

মুহাম্মাদ আল রাওয়ী বলেন যে, শরীর থেকে যখন শারীরিক রূহ্ বিচ্ছিন্ন হয়, তখন সবাই স্পষ্টতই তা বুঝতে পারে – মানুষজন সেই প্রাণহীন শরীরকে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করে, কেননা রূহের তিরোধানের পরে সেই দেহ আর কোন কাজ করতে পারে না। বলা যায় সেই দেহ একরকম অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। অথচ, একজন মানুষের উপর যখন কুর’আনের আর কোন প্রভাব থাকে না, তখন সে অবস্থাটাকে সনাক্ত করতে মানুষ প্রায়ই ব্যর্থ হয়। যখন কারো জীবন থেকে কুর’আন স্বরূপ রূহ্ হারিয়ে যায়, জীবন ও আখিরাতের নিরিখে আলোচ্য ব্যক্তির কি ক্ষতি সাধিত হয়, তা তারা দেখে না। তার চারপাশের সকলের কাছে তাকে জীবিত মনে হলেও, ঐ রূহ্ ছাড়া সত্যিকার অর্থে সে আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে মৃত এক ব্যক্তিতে পরিণত হয়। সে মৃত, কেননা সে এমনকি তার জীবনের উদ্দেশ্য কি, তাও বুঝতে অক্ষম।সে এমন একটা জীবন যাপন করে, যে জীবন তার সঠিক গন্তব্যের দিকে পরিচালিত নয়। আর তাই এক্ষেত্রে তার শারীরিক মৃত্যু সংঘটিত হলেও আসলে কিছু আসে যায় না।

উপরে উদ্ধৃত আয়াতে এবং কুর’আনের অন্যান্য আয়াতেও আল্লাহ্ পবিত্র কুর’আনকে এক আলো (নূর) হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আল্লাহ্ বলেন,

وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
“এভাবে আমি আমার আদেশের এক রূহ্ তোমার কাছে প্রেরণ করেছি। কিতাব কি অথবা ঈমান কি তা তুমি জানতে না। কিন্তু আমি একে (এই কুর’আনকে) আলো বানিয়ে দিয়েছি, যা দ্বারা আমার দাসদের যাকে ইচ্ছা তাকে আমি দিক নির্দেশনা দিই। নিশ্চয়ই তুমি (মানবকুলকে) সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা দাও।” (সূরা শূরা, ৪২:৫২)

আলো কোন ব্যক্তিকে তার সামনের পথ দেখায়। আলো দিয়ে সে তার চলার পথের বিপজ্জনক বস্তুসমূহ এড়িয়ে চলে এবং সে তার জন্য সবচেয়ে লাভজনক রাস্তা অনুসরণ করে গন্তব্যের দিকে যায়। যাহোক, আল ফাওযান বলছেন যে, কুর’আন যে ধরনের ‘আলো’ বা ‘নূর’ – তা আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা যে আলো অনুভব করি, তার চেয়ে ভিন্ন। এটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক আলো। এ আলো দিয়ে আমরা পার্থিব ও ধর্মীয় জগতের কি কি আমাদের জন্য লাভজনক তা সনাক্ত করতে পারি। এ আলোর সাহায্যে কেউ সত্যি থেকে মিথ্যাকে আলাদা করতে পারবে এবং জান্নাতমুখী পথ অনুসরণ করতে পারবে।

এই আলো মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকীম বা সরল পথ এবং আল্লাহর দয়া ও করুণার পথ দেখায়। আমাদের এই প্রচেষ্টায় যেমন প্রায়ই এ প্রসঙ্গ আসতে থাকবে – লক্ষ্যণীয় যে, এই আলো কেবল তাদের জন্যই লাভজনক যারা সেটাকে অনুসরণ করবে। আল্লাহ্ বলেন :

يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُبِينًا (174) فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيُدْخِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا
হে মানবকুল! অবশ্যই তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে তোমাদের কাছে নিশ্চিত প্রমাণ অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমি তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট আলো নাযিল করেছি (এই কুরআন), তাই যারা আল্লাহয় বিশ্বাস করেছে এবং একে (এই কুরআনকে) আঁকড়ে ধরেছে, তিনি তাদের তাঁর করুণা দয়ার আশ্রয় দেবেন এবং তাদের এক সরলপথের মাধ্যমে তাঁর দিকে নিয়ে যাবেন। (সূরা নিসা, ৪:১৭৪-১৭৫)

উপরের আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বাসীদের জীবনের সত্যিকার চাবিকাঠিই হচ্ছে কুর’আন। কুর’আন ছাড়া একজন মানুষ তাই আধ্যাত্মিক মৃত্যু ও অন্ধকারের মাঝে পতিত। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের যেভাবে তাঁর নাযিলকৃত পথ-নির্দেশনা দ্বারা আশীর্বাদ করেন, সে সম্বন্ধে তিনি বলছেন :

أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا
যে মৃত ছিল এবং যাকে আমি জীবন দিলাম এমন এক আলো দান করলাম যার সাহায্যে সে মানুষের মাঝে চলাচল করতে পারে, সে কি ব্যক্তির মত, যে গভীর অন্ধকারে ডুবে আছেযা থেকে সে কখনোই বেরিয়ে আসতে পারবে না? ..” (সূরা আন্‘আম, ৬:১২২)

(চলবে ………….ইনশা’আল্লাহ্!)

কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ৭

Posted: 14 May 2011 09:35 PM PDT

মূলঃ মেরিনার

[মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]

…………..পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:

কুরআন সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহর (সা.) বক্তব্য

রাসূল (সা.) – যাঁর কাছে কুর’আনের বাণী সরাসরি নাযিল হয় এবং যিনি সেই অনুযায়ী তাঁর জীবন যাপন করে গেছেন – তিনিও আমাদের কুর’আনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলে গেছেন। নীচে, আমরা তাই তাঁর সেসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দৃষ্টি-খুলে-দেয়া বক্তব্যের একটা ক্ষুদ্র অংশ আপনাদের/পাঠকের অবগতির জন্য তুলে দিচ্ছি।

রাসূল (সা.) এ ব্যাপারটা স্পষ্ট করে গেছেন যে, এই কুর’আন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট আশীর্বাদ ও অলৌকিক নিদর্শন। নিম্নলিখিত হাদীসে, রাসূল (সা.) পূর্ববর্তী নবীদের আল্লাহর তরফ থেকে দেয়া অলৌকিক নিদর্শনসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্যান্য নবীদের দ্বারা প্রদর্শিত অলৌকিক ব্যাপারসমূহ যদিও নিঃসন্দেহে মর্যাদাপূর্ণ ছিল, তবুও সেগুলোর সঙ্গে রাসূল (সা.)-এঁর সাথে সর্বদা বিরাজমান এই অলৌকিক নিদর্শনের কোন তুলনা হতে পারে না – এমনকি মূসা (আ.)-কে যে লাঠি দেয়া হয়েছিল – অথবা ঈসা (আ.)-কে মৃতকে জীবিত করার বা অন্ধকে দৃষ্টিদানের যে অলৌকিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল – সেগুলোকেও, কুর’আনের আঙ্গিকে নবী মুহাম্মাদ (সা.) যা লাভ করেছেন, তার সাথে তুলনা করা যায় না। আর এ জন্যই কিয়ামতের দিন, নবীদের মাঝে তাঁর নিজের অনুসারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে, এ ধরনের আশা করার পেছনে রাসূল (সা.)-এঁর যথাযথ কারণ ছিল। রাসূল (সা) বলেন :
নবীদের মাঝে এমন কেউ ছিলেন না যাঁকে এমন কিছু না দেয়া হয়েছে, যা দেখে লোকে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কিন্তু আমাকে কেবল এক ওহী দান করা হয়েছে, যা আল্লাহ্ আমার কাছে প্রেরণ করেছেন। তাই আমি আশা করি পুনরুত্থান দিবসে অন্য নবীদের চেয়ে আমার অনুসারীদের সংখ্যা বেশি হবে। (বুখারী)

আল-কুর’আন অর্থাৎ আল্লাহর কথা ও বাণীর এই সংকলনের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে খানিকটা আলোকপাত করে, আরেকটি হাদীস রয়েছে যেখানে রাসূল (সা.) বলেন :
সকল বাণীর উপর আল্লাহর বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে তাঁর সৃষ্টির উপর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের মতই ।
(আত-তিরমিযী, আদ-দারিমী)

কেউ যখন এরকম করে কুর’আনের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃতি অনুধাবন করতে পারবে, তখন সে নিশ্চয়ই তার সময়কে এই বাণী পড়ার কাজে নিয়োগ করতে পারবে। এবং একে অবজ্ঞা করতে পারবে না অথবা, দিক নির্দেশনার জন্য অন্য কোন উৎসের দিকে ফিরে তাকানোরও প্রয়োজন হবে না তার । রাসূল (সা.) কুর’আন সম্বন্ধে আরো বলেছেন :
তোমাদের জন্য সুসংবাদ! নিশ্চয়ই এই কুরআনের এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং অপর প্রান্ত তোমাদের হাতে। এর সাথে লেগে থাক, তাহলে তোমরা কখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না এবং তার পরে তোমরা কখনো বিপথগামীও হবে না। (আত-তাবারানী – আলবানীর মতে হাদীসটি সহীহ)

অপর একটি হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন :
হে লোকসকল, নিশ্চিতই আমি কেবলি একজন মানুষ এবং অচিরেই আমার প্রভুর কাছ থেকে একজন বার্তাবাহক আমার কাছে আসতে পারেন এবং আমি তার ডাকে সাড়া দেব (অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করবো)। আমি তোমাদের জন্য দুটি গুরুভার বস্তু রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। যার মাঝে রয়েছে দিক নির্দেশনা ও আলো। যে এর সাথে লেগে থাকবে এবং এর অনুসরণ করবে সে সঠিক পথের উপর থাকবে। যে এর সাথে লেগে থাকতে ব্যর্থ হবে সে বিপথগামী হবে। সুতরাং আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর এবং এর সাথে লেগে থাক। … (আহমাদ)

আরেকটি হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন :
“ ‘নিশ্চিত এই মানবজাতির মাঝে, আল্লাহর বিশেষ জনগোষ্ঠী রয়েছে।তারা জিজ্ঞেস করলো, ‘হে আল্লাহর রাসূল, তারা কারা?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তারা হচ্ছে কুরআনের জনগোষ্ঠী। তারা হচ্ছে আল্লাহর জনগোষ্ঠী এবং বিশেষভাবে তাঁর।’ ” (আহমাদ, ইবনে মাজা, নাসাঈ – আলবানীর মতে সহীহ)

রাসূল (সা.) আরো বলেছেন :
তোমাদের মাঝে সেই সর্বশ্রেষ্ঠ যে কুরআন শিখে ও অন্যদের শিক্ষা দেয়।(বুখারী)

কুর’আন সম্বন্ধে তিনি আরো বলেছেন :
জ্ঞান আহরণের জন্য যে কেউ যখন কোন পথ অনুসরণ করবে, আল্লাহ্ সেজন্য, তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেবেন। এমন কোন জনসমষ্টি নেই, যারা আল্লাহর ঘরগুলির কোন একটিতে সমবেত হয়ে নিজেদের মাঝে কুরআন পাঠ করে ও অধ্যয়ন করে, অথচ তাদের উপর প্রশান্তি নেমে আসে না, রহমত নেমে আসে না, ফেরেশতারা তাদের পাশে আসে না এবং আল্লাহ্, তাঁর কাছে উপস্থিতদের কাছে তাদের নাম উল্লেখ করেন না। কর্মফলের বিচারে যে পিছিয়ে পড়বে, বংশপরিচয়ের উৎকৃষ্টতা তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। (মুসলিম)

আরেকটি বর্ণনায় আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন :
কুরআন তিলাওয়াতকারী মুমিনের উদাহরণ হচ্ছে সেই লেবুর মত যা স্বাদে ও গন্ধে উত্তম এবং সে, যে কুরআন তিলাওয়াত করে না তার অবস্থা হচ্ছে ঐ খেজুরের মত যা স্বাদে উত্তম কিন্তু যার কোন গন্ধ নেই এবং যে মুনাফিক কুরআন তিলাওয়াত করে, তার উদাহরণ হচ্ছে রাইহানা বৃক্ষের মত যার সুগন্ধ রয়েছে, কিন্তু স্বাদে যা তিক্ত। আর সেই মুনাফিক যে কুরআন তিলাওয়াত করে না, তার উদাহরণ হচ্ছে হানযালাহ্, যা স্বাদে তিক্ত এবং যার কোন গন্ধও নেই।(বুখারী)

এই হাদীসে কুর’আনের মাহাত্ম্য ও উন্নত প্রকৃতি প্রকাশিত হয় – যা একজন মুনাফিকের মুখে উচ্চারিত হলেও তার সুগন্ধ পারিপার্শ্বিকতায় ছড়িয়ে পড়ে।

সবশেষে আমরা আরেকটি হাদীস উদ্ধৃত করবো যেখানে আল্লাহ কিতাবের গুরুত্ব যথাযথরূপে প্রকাশিত হয়েছে। এই হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন :
পবিত্র কুরআন হয় তোমার পক্ষে অথবা তোমার বিপক্ষে সুপারিশ করে। (মুসলিম)

এখানে আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্টত বলছেন যে, কুর’আন হয় কারো পক্ষে অথবা তার বিপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ হবে। এখানে কোন নিরপেক্ষ অবস্থান নেই। যে কাউকে দুটো দলের একটির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এই বক্তব্য পবিত্র কুর’আনে আল্লাহর নিম্নলিখিত বক্তব্যের সদৃশ :

এবং আমরা এই কুরআন নাযিল করেছি যা বিশ্বাসীদের জন্য শিফা ও রহমত। আর জালিমদের জন্য এটা তাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না। (সূরা ইসরা, ১৭:৮২)

কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ৮

Posted: 17 May 2011 01:32 AM PDT

মূলঃ মেরিনার

[মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]

…………..পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:

যারাকুরআনজানতেনএবংকুরআনকেজীবনেধারণকরেছিলেন, কুরআনসম্বন্ধেতাঁদেরবক্তব্য

কুর’আন সম্বন্ধে আরো বিস্তারিত ধারণা লাভ করতে, এরপর তাঁদের কাছে যাওয়া উচিত যাঁরা কুর’আনকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং এর পথনির্দেশক আলোর মাঝে জীবন যাপন করেছিলেন। এই শ্রেণীর শীর্ষে থাকবেন রাসূল(সা.)-এঁর সাহাবীগণ – যাঁরা তাদের কুর’আন শিক্ষার সিংহভাগ সরাসরি রাসূল (সা.)-এঁর কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। পবিত্র কুর’আন বলতে আসলে কি বোঝায়, তার সবচেয়ে সুন্দর ও যথার্থ বর্ণনার একটি এসেছে চতুর্থ খলীফা হযরত আলী বিন আবু তালিবের (রা.) কাছ থেকে। আলী (রা.) একদা বলেছিলেন :
আল্লাহর কিতাবের সাথে লেগে থাকো, যা পূর্ববর্তীদের ভবিষ্যতে যারা আসবে তাদের কথা বলে এবং স্পষ্ট সুনির্দিষ্ট ভাষায় সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে সত্য কথা বলে, যা নিয়ে তোমরা ভিন্নমত পোষণ কর। যে কেউ অহমিকাবশত এর অবহেলা করলো, আল্লাহ্ তাকে লাঞ্ছিত করবেন। আর যে কেউ অন্যত্র দিক নির্দেশনা খুঁজে বেড়ালো, আল্লাহ্ তাকে পথভ্রষ্ট করবেন। এটা হচ্ছে আল্লাহর সাথের যোগসূত্র, একমাত্র জ্ঞানগর্ভ বাণী এবং একমাত্র সঠিক পথযা কখনোই দুষ্ট চিত্ত দ্বারা বিকৃত হবে না অথবা দুষ্ট জিহ্বা দ্বারা পরিবর্তিত হবে না। এর রহস্য কখনোই অনাবৃত হবে না অথবা জ্ঞানীগুণীগণ থেকে জ্ঞানলাভ করে পরিতৃপ্ত হবে না। যে কেউ এর অনুযায়ী কথা বলে, সে সত্য কথা বললো ; যে কেউ এর অনুযায়ী কাজ করলো, সে পুরস্কৃত হবে ; যে এর দ্বারা শাসন করে, সে সুবিচার করলো ; এবং যে এর দিকে অন্যকে আহবান করে, সে সরল পথ দেখালো। [আলবানীর মতে বক্তব্যটি আলী বিন আবু তালিবের (রাঃ)]

রাসূল (সা.)-এঁর সাহাবী এবং কুর’আন বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একদা বলেন, কুরআন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা ছাড়া কাউকে তার নিজের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। কেউ যদি কুরআনকে ভালবাসে, তবে সে আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে ভালবাসে। অপর সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, কেউ যখন কুরআন পড়ে, তখন ব্যাপারটা অনেকটা একরম যেন তার উপর নবুওয়্যত নাযিল হচ্ছে, কেবল এটুকু ছাড়া যে তার কাছে কোন ওহী আসছে না। আর কেউ যখন কুরআন পড়ে এবং বিশ্বাস করে যে তার কাছে যা রয়েছে তার চেয়ে ভাল কিছু অন্যের কাছে রয়েছে, তখন সে এমন কিছুকে মাহাত্ম্য দান করলো যেটাকে আল্লাহ্ ক্ষুদ্রতা দান করেছেন এবং এমন কিছুকে সে তুচ্ছ জ্ঞান করলো যাকে আল্লাহ্ মর্যাদা দিয়েছেন।(আবু ইসহাক আল হুয়াইনি)

সহীহ বুখারী এবং মুসলিমে যেমন বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবী, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এঁর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন তিনি লোকজনকে আল্লাহর কিতাব শিক্ষা দিতে পারেন। সেই ইবনে আব্বাস (রা.) পবিত্র কুর’আন সম্বন্ধে বলেছেন:
“ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর নিয়ামত এবং তিনি যে তোমাদের কুর’আনের জনগোষ্ঠী বানিয়েছেন, তা হচ্ছে তোমাদের প্রতি তাঁর করুণা।”

বাস্তবিকই, আর-রাহমান নামক সূরা, যেখানে আল্লাহ্ মানুষকে দান করা তাঁর বহু নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন, সেই সূরার শুরুতে আল্লাহ্ বলেছেন :

পরম দয়ালু আল্লাহ্(হে মানব তোমাদের) কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন (করুণাবশত) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।(সূরা রাহমান, ৫৫:১-৩)

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ্ তাঁর দয়ার বশবর্তী হয়ে করা কাজ হিসেবে মানবতার সৃষ্টির আগে, মানুষকে কুর’আনের শিক্ষা দেওয়ার কাজকে স্থান দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কোন কোন জ্ঞানীজনেরা বলে থাকেন যে, উপরোক্ত আয়াতে এই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহর কুর’আন শিক্ষাদানের কাজ, তাঁর মানবকুল সৃষ্টির কাজের চেয়ে অধিকতর বড় দয়ার নিদর্শন। এই তাফসীর বা ব্যাখ্যা, উপরে উদ্ধৃত কুর’আন সম্বন্ধে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) উক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

উসমান ইবনে আফফান (রা.) এবং হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) দুজনেই বলে গেছেন :
“হৃদয় যখন পবিত্র হয়, তখন তা কুর’আন পড়তে গিয়ে তৃপ্তি লাভ করে ক্ষান্ত হতে পারে না।(অর্থাৎ সে আরো বেশী বেশী করে কুর’আন পড়তে চাইবে)” সুফিয়ান আসসাওরী(রহ.), যিনি রাসূলের (সা.) সাহাবীদের শিষ্য ছিলেন – তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, তিনি জিহাদ অথবা কুর’আন পড়া – কোনটিকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, তিনি কুর’আন পড়াকে অগ্রাধিকার দেন এবং তিনি তাঁর পছন্দের দলিল হিসেবে নিম্নলিখিত হাদীসটির উল্লেখ করেন যা আমরা আগেও উদ্ধৃত করেছি :
তোমাদের ভিতর সেই শ্রেষ্ঠ যে কুরআন শিক্ষা করে অন্যদের তা শিক্ষা দেয়।(বুখারী)

এ ব্যাপারে সাইয়্যিদ সাঈদ আবদুল গণি, সুফিয়ানের দৃষ্টিভঙ্গী সমর্থন করে বলেন :
সুফিয়ান আসসাওরী যে জিহাদের উপর কুরআনের তিলাওয়াতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কেননা এমন বহু মানুষ রয়েছে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারে, জিহাদে অংশগ্রহণ করার মত প্রয়োজনীয় গুণাবলী মুসলিম উম্মার অনেকের মাঝেই বিদ্যমান। কিন্তু যারা চমৎকার কুরআন তিলাওয়াত করেন, যারা কুরআনিক আইনের জ্ঞান রাখেন এবং যারা অন্য মুসলিমদের কুরআন শিক্ষা দিতে পারেনএমন ব্যক্তির সংখ্যা কম। সুতরাং তারা পিছনে থেকে মুসলিমদের আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা দেবেনএই ব্যাপারটা তাদের জিহাদে অংশগ্রহণের চেয়ে নিঃসন্দেহে শ্রেয়। বিশেষত যে ক্ষেত্রে জিহাদে যাওয়াটা সম্প্রদায়ভিত্তিক দায়িত্ব (ফরযে কিফায়া) এবং অন্যেরা সে দায়িত্ব পালন করছেনসে ক্ষেত্রে কুরআন শেখা অন্য মুসলিমকে তা শিক্ষা দেওয়ার কাজটাই এক ধরনের জিহাদ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: